গ্রামীণের সঙ্গে সহযোগিতায় জার্মান সংস্থা
সমাজ জীবন | 17.03.2009
গ্রামীণের সঙ্গে সহযোগিতায় জার্মান সংস্থা
গ্রামীণ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন, যে সামাজিক কল্যাণের জন্য কাজ করছে – এমন সংস্থায় বিনিয়োগ করলে নিজের ভাবমূর্তি বেড়ে যায়, নতুন গ্রাহক পাওয়া যায়, এমনকী মুনাফাও করা যায়৷ এবার জার্মানির বিখ্যাত শিল্প সংস্থা বি এ এস এফ গ্রামীণ গ্রুপের সঙ্গে এক নতুন প্রকল্প শুরু করেছে৷
যৌথ উদ্যোগের লক্ষ্য
বি এ এস এফ এবং গ্রামীণ হেলথ কেয়ার ট্রাস্ট একযোগে এক নতুন সংস্থার জন্ম দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য – বাংলাদেশে গুঁড়ো ভিটামিন ওষুধ ও মশারি বিক্রি করা৷ আপাতদৃষ্টিতে এমন এক উদ্যোগের মধ্যে কোনো নতুনত্ব নেই৷ কিন্তু এই সহযোগিতার পেছনে ব্যবসার এমন এক মডেল লুকিয়ে রয়েছে, যা উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিপ্লব বয়ে আনতে পারে৷ অধ্যাপক মহম্মদ ইউনুস এই ধরণের উদ্যোগকে ব্যবসায়িক মডেলকে ‘সোশাল বিজনেস' হিসেবে তুলে ধরেছেন৷
গ্রামীণ ক্রিয়েটিভ ল্যাবের সাস্কিয়া ব্রুইস্টেন এবিষয়ে বলেন, ‘‘অধ্যাপক ইউনুস বলেন, প্রচলিত ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও ব্যবসার সুযোগ থাকা উচিত, যার ভিত্তি পুরোপুরি সাধারণ ব্যবসার মতোই৷
Bildunterschrift: Großansicht des Bildes mit der Bildunterschrift: জার্মানির বি এ এস এফ বাংলাদেশে গ্রামীণ গোষ্ঠীর বিশাল নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করতে আগ্রহী৷অর্থাৎ মুনাফার উদ্দেশ্যেই সেই ব্যবসা চালানো হবে, যদিও লক্ষ্য হবে সামাজিক উন্নয়ন৷ তফাত শুধু একটাই৷ সেই মুনাফা লগ্নীকারীর কাছে ফিরে যাবে না – তাকে মূলধনের অর্থ ফিরিয়ে দিয়ে মুনাফার বাকি অর্থ আবার বিনিয়োগ করা হবে৷''
জার্মানির বি এ এস এফ বাংলাদেশে গ্রামীণ গোষ্ঠীর বিশাল নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে ঠিক এই মডেলেই ব্যবসা করতে আগ্রহী৷ এক্ষেত্রে বি এ এস এফ পণ্য সরবরাহ করবে – গ্রামীণ তার বিপণনের জন্য কাজ করবে৷ ১০ লক্ষ প্যাকেট গুঁড়ো ভিটামিন ওষুধ ও ১ লক্ষ মশারি বিক্রি করতে জার্মানির ঐ সংস্থার প্রাথমিক মূলধন ২ লক্ষ ইউরো৷ বাংলাদেশের জন্য এই অর্থ বড় মনে হলেও বি এ এস এফ-এর কাছে তা নিতান্তই সামান্য অঙ্ক৷
বি এ এস এফ-এর ম্যানেজার উলরিশ ফন ডেসেন বলেন, ‘‘বি এ এস এফ বছরে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি ইউরো বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে ব্যয় করে – যার মধ্যে কিছু অংশ অনুদান৷ বিশেষ করে শিক্ষা খাতে বেশী ব্যয় করা হয়৷''
সফল মডেল
এমন এক প্রকল্প যে সফল হতে পারে, গ্রামীণ ব্যঙ্কের ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে অধ্যাপক ইউনুস তা স্পষ্ট দেখিয়ে দিয়েছেন৷ এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান৷ গ্রামীণ ব্যাঙ্ক গ্রামাঞ্চলে প্রধানত নারীদের ১০ থেকে ১০০ ইউরোর সমান ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে থাকে৷ সুদের হার প্রায় ২০ শতাংশ, যা বেশ চড়া হলেও ঋণ শোধ করার ক্ষেত্রে তেমন সমস্যা দেখা যায় না৷ যেমন গ্রামের কোনো নারী ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণ করে সেলাইয়ের যন্ত্র কিনে দ্রুত কাজ শুরু করে এবং খুব দ্রুত ঋণ পরিশোধ করে দেয়৷
শুধু বাংলাদেশেই গ্রামীণ ব্যাঙ্কের গ্রাহক সংখ্যা ৮০ লক্ষেরও বেশী৷ ক্ষুদ্র ঋণের এই ব্যবসায়িক মডেল এতটাই সফল হয়েছে, যে আজ গোটা বিশ্বের অনেক দেশেই তা অনুকরণ করা হচ্ছে৷ শুধু ব্যাঙ্ক নয় – অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রয়োগ করার বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা চলছে৷
বি এ এস এফ-এর ম্যানেজার উলরিশ ফন ডেসেন মনে করেন, ‘‘আমরা আসলে মানুষের মধ্যে উদ্যোগের স্পৃহায় বিনিয়োগ করছি৷ যারা পরোক্ষভাবে দান গ্রহণ করে থাকে, তাদের সক্রিয় ব্যবসায়ীতে রূপান্তরিত করতে চাই আমরা৷ এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেই চেষ্টাই চালাতে চাই আমরা৷ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, যে নিঃশর্ত দানের কার্যকারিতা খুবই সীমিত৷''
বি এ এস এফ-এর আগে ফ্রান্সের দানোন কোম্পানিও বাংলাদেশে গ্রামীণ গ্রুপের সঙ্গে একযোগে একই মডেলে বিনিয়োগ করেছিল৷ বি এ এস এফ-এর লক্ষ্যমাত্রা হল, আগামী ২০১৩ সাল পর্যন্ত বছরে ২ লক্ষেরও বেশী মশারি এবং দেড় কোটি গুঁড়ো ভিটামিন ওষুধের প্যাকেট বিক্রি করা৷ মুনাফা না হলেও মূলধনের অর্থ উঠে এলেও তা বিশাল সাফল্য বলে মনে করবে বি এ এস এফ৷ কারণ মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক বিনিয়োগের অর্থ – অর্থাৎ ২ লক্ষ ইউরো বার বার এইভাবে উঠে আসবে৷
লেখক: ক্লাউস উলরিশ, অনুবাদক: সঞ্জীব বর্মন, সম্পাদক: আব্দুল্লাহ আল-ফারুক, ব্লগ: মনাজ হক

